ক্রাইসিস বা সঙ্কট এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে একটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কারণে বিপদে পড়ে। এই ধরনের পরিস্থিতি সাধারণত কোম্পানির অর্থনৈতিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে, তার ব্র্যান্ড ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। তবে, সঠিক ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কৌশল গ্রহণ করলে একটি প্রতিষ্ঠান তার সঙ্কট মোকাবেলা করতে এবং তা থেকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট মূলত পরিকল্পনা, কৌশল এবং উপযুক্ত সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে কোন কোম্পানি ভবিষ্যতে একই ধরনের সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে এবং তাদের সুনাম পুনঃস্থাপন করতে পারে। ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট একটি কার্যকরী নেতৃত্বের প্রমাণ, যা সংকটকালীন সময়ে দ্রুত এবং সঠিক পদক্ষেপ নেয়।
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের প্রকারভেদ
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের বিভিন্ন প্রকারভেদ থাকতে পারে, যার মধ্যে প্রধান কিছু হলো:
-
প্রাকৃতিক দুর্যোগ: যেমন ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি।
-
অর্থনৈতিক সংকট: যেমন আর্থিক ক্ষতি, বাণিজ্যিক ঘাটতি, মার্কেট ধ্বস ইত্যাদি।
-
প্রযুক্তিগত বা সাইবার ক্রাইসিস: যেমন সাইবার আক্রমণ, ডাটা চুরি, প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা ইত্যাদি।
-
সম্পর্কজনিত বা ব্র্যান্ড ক্রাইসিস: যেমন মিডিয়া স্ক্যান্ডাল, নেতিবাচক পর্যালোচনা, বিপণন কৌশলের ব্যর্থতা ইত্যাদি।
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়া
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সফলভাবে কার্যকর করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়:
-
সঙ্কট সনাক্তকরণ ও মূল্যায়ন: প্রথমেই সঙ্কটের প্রকৃতি এবং তার প্রভাব নির্ধারণ করতে হবে। এটি ব্যবসার জন্য ছোট বা বড় কোন ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেটি বুঝতে হবে।
-
যথাযথ পরিকল্পনা তৈরি: সঙ্কটের উপর ভিত্তি করে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এই পরিকল্পনা পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কী হবে তা নির্ধারণ করে এবং তা কর্মীরা কিভাবে পালন করবেন সেটি স্পষ্ট করতে হয়।
-
দ্রুত ও কার্যকরী যোগাযোগ: সঙ্কটকালীন সময়ে দ্রুত এবং স্বচ্ছ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গ্রাহক, স্টেকহোল্ডার, মিডিয়া ও কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ সঠিকভাবে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
-
সমাধান খোঁজা ও পদক্ষেপ গ্রহণ: সঙ্কটের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে যথাযথ সমাধান খোঁজা এবং তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা।
-
ফলাফল মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: সঙ্কট শেষে সফলতার পরিমাণ মূল্যায়ন করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের সঙ্কট মোকাবেলা করা যায়।
কেস স্টাডি: “Tylenol” এর সঙ্কট ম্যানেজমেন্ট
একটি বিশ্ববিখ্যাত উদাহরণ হলো Tylenol (যা বর্তমানে Johnson & Johnson এর একটি পণ্য)। ১৯৮২ সালে Tylenol এর কিছু ক্যাপসুলে সাইয়ানাইড মিশিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়, যার ফলে কয়েকজন মানুষ নিহত হন। এটি ছিল ব্র্যান্ডের জন্য একটি ভয়ানক সঙ্কট। তবে, Johnson & Johnson তাদের দ্রুত এবং কার্যকরী ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কৌশল দ্বারা এই সঙ্কটকে মোকাবেলা করে এবং পরবর্তী সময়ে ব্র্যান্ডের সুনাম পুনরুদ্ধার করে।
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের পদক্ষেপ
-
দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ: Johnson & Johnson তাদের পুরো Tylenol পণ্য প্রত্যাহার করে নেয় বাজার থেকে, যা প্রায় ৩১ মিলিয়ন বোতল ছিল। এই পদক্ষেপটি ছিল একটি সাহসী সিদ্ধান্ত, কারণ এর ফলে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল।
-
গ্রাহকদের প্রতি দায়িত্বশীল মনোভাব: তারা গ্রাহকদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাজারে নিরাপদ ক্যাপসুল বিক্রি করতে শুরু করে এবং গ্রাহকদের ফেরত দেওয়ার জন্য পূর্ণ অর্থ ফেরত দিতে শুরু করে।
-
খোলামেলা যোগাযোগ: তারা মিডিয়ার মাধ্যমে ক্রমাগত সঙ্কট সম্পর্কে খোলামেলা তথ্য প্রদান করে। মিডিয়া ও গ্রাহকদের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে তারা ব্যাপক প্রচেষ্টা চালায়।
-
নতুন প্যাকেজিং প্রযুক্তি প্রবর্তন: সঙ্কট পরবর্তী সময়ে তারা নতুন প্যাকেজিং প্রযুক্তি চালু করে, যা পণ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল।
এই পদক্ষেপগুলো Johnson & Johnson এর ব্র্যান্ড সুনামকে বজায় রেখেছিল এবং তাদের আর্থিক ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার হয়।
কেস স্টাডি: “Volkswagen” এর ডিজেল ইমিশন স্ক্যান্ডাল
২০১৫ সালে Volkswagen এর ডিজেল ইমিশন স্ক্যান্ডাল ছিল একটি বড় সঙ্কট, যেখানে জানা যায় যে তারা গোপনে তাদের গাড়ির ইমিশন টেস্ট ফাঁকি দিয়েছে। এই ঘটনাটি কোম্পানির ভাবমূর্তি ও গ্রাহক আস্থা হারানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের পদক্ষেপ
-
কোম্পানির স্বীকারোক্তি: Volkswagen প্রথমেই এই ত্রুটি স্বীকার করে নেয় এবং জনগণের কাছে ক্ষমা চায়। এটি কোম্পানির জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল।
-
গ্রাহকদের পুনরুদ্ধার ও ক্ষতিপূরণ: কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দিতে শুরু করে এবং তাদের পণ্য বিক্রি ও সেবা সম্পর্কিত উদ্যোগে ব্যাপক পরিবর্তন আনে।
-
অন্যান্য পদক্ষেপ: তারা ইমিশন স্ট্যান্ডার্ড উন্নত করতে শুরু করে এবং পরিবেশবান্ধব নতুন পণ্য বাজারে নিয়ে আসে।
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট শুধুমাত্র একটি সঙ্কট মোকাবেলার প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিক কৌশল এবং সঠিক সময়ে নেওয়া পদক্ষেপ আপনার প্রতিষ্ঠানকে এক কদম এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। সঙ্কটকালীন সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং খোলামেলা যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যবসা আবারও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যেমনটি Tylenol এবং Volkswagen এর মতো কোম্পানির ক্ষেত্রে ঘটেছে।
রেফারেন্স
-
Fearn-Banks, K. (2016). Crisis Communications: A Casebook Approach. Routledge.
-
Coombs, W. T. (2014). Ongoing Crisis Communication: Planning, Managing, and Responding. SAGE Publications.
-
Johnson & Johnson. (1982). Tylenol Crisis: A Case Study. Harvard Business Review.
-
Volkswagen Group. (2015). Emissions Scandal and Crisis Management. Volkswagen Group Press Release.
0 Comments